গাইবান্ধায় চার বছরে কোটি টাকার সম্পদ গড়লেন পৌর কর্মচারী

0
9

তৌহিদুর রহমান তুহিন গাইবান্ধা প্রতিনিধিঃ গাইবান্ধা পৌরসভার সাঁটলিপিকার মিলন কুমার সরকার। ক্ষমতার দাপটে কাউকেই যেন গ্রাহ্য করেন না তিনি। টাকা ছাড়া কিছুই বোঝেন না তিনি। গত ২৫ বছরে মেয়রদের কাছে তার বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক অভিযোগ করেছিলেন পৌরসভায় সেবা নিতে আসা বিভিন্ন নাগরিক। নানা কায়দায় মেয়রদের আকৃষ্ট করে তার সেই অভিযোগগুলো সবসময় আড়াল করে ভালো মানুষ সাজার চেষ্টা করতেন তিনি। এছাড়া বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ার পাশাপাশি মিলন সরকার ব্যাংকে রেখেছেন কোটি কোটি টাকা।

তার লাগামহীন দুর্নীতির তান্ডব যেন পুকুর চুরিকেও হার মানায়। অফিসের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর না করে মাসের পর মাস বেতন তোলা। টাকার বিনিময়ে মাস্টার রোলে লোক নিয়োগ, অফিসের বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ কাজ আদায়সহ নানা অভিযোগ আছে মিলন সরকারের বিরুদ্ধে। এমনকি গোরস্থানের কবর পাকা করার জায়গা বিক্রি করে ভুয়া রশিদে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার মতো ভয়ঙ্কর অভিযোগও রয়েছে। পৌরসভায় যতগুলো ক্লিনিক রয়েছে সেগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য আদায়কৃত টাকার বিপরীতে ক্লিনিক মালিকদের রশিদ না দিয়ে প্রতি বছর বড় অংকের টাকা আত্মসাত করেন এই মিলন সরকার। পৌরসভায় তার একটা বড় সিন্ডিকেট আছে। উপর মহলের যোগসাজসে সেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনৈতিক কাজ বাস্তবায়ন করেন। পৌরসভায় যত দৈনিকভিত্তিক শ্রমিক-কর্মচারী আছে তাদের অধিকাংশের নিয়ম বহির্ভুতভাবে টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেন মিলন।

ক্ষমতা দেখিয়ে পৌর তহবিল থেকে মাসের পর মাস নামে বেনামে বিল করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাত করেছেন বলেও অভিযোগ আছে তার নামে। বর্জ্য নিষ্কাশনের গাড়ি ভাড়া, রোলার ভাড়া, ট্রাক ভাড়া, বুলড্রোজার ভাড়ার অধিকাংশ টাকা পৌর তহবিলে জমা না দিয়ে তার নিজ নামিয় একাউন্টে জমা করতেন। অতিরিক্ত পরিছন্ন কর্মীদের বেতন বাবদ ব্যয় দেখিয়ে পৌর তহবিলের টাকা নিজের পকেটে ঢোকান মিলন। পাশাপাশি মাত্রাতিরিক্ত জ্বালানি ক্রয় দেখিয়ে লুটে নেন হাজার হাজার টাকা। অটোবাইক লাইসেন্সের এলআর ফান্ডের কোটি টাকা পৌর তহবিলে জমা না করে মিলন সরকার তার নিজের একাউন্টে রেখে আত্মসাত করেন বলে অভিযোগ আছে। এছাড়াও অটোবাইকের নবায়ন ফি বাবদ নির্ধারিত ফরম মূল্যের বিপরীতে রশিদ না দিয়ে টাকা লোপাট করতেন তিনি। সম্প্রতি এ বিষয়ে একজন ভুক্তভোগী জেলা প্রশাসক বরাবর তার বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন। এই মিলন সরকারকে কেউ কিছু বলার সাহস পেত না।

অফিস স্টাফরা তার অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই তাদের হুমকিসহ নানা রকম হয়রানি করা হতো। কিছু কর্মচারীকে তিনি খেয়ালখুশি মতো বিভিন্ন শাখায় কাজ করাতে বাধ্য করতেন। সাঁটলিপিকার মিলন কুমার সরকার গত সাড়ে চার বছরে অবৈধভাবে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন। করেছেন জেলার দুই উপজেলায় বিলাশ বহুল তিনটি বাড়ি। এছাড়াও নিজ নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে কিনেছেন কোটি টাকার জমি। ২০১৯ সালে গাইবান্ধা শহরের গোবিন্দপুর মৌজায় বাড়িসহ সাত শতাংশ জমি কিনেছেন ৫০ লাখ টাকায়। রাজস্ব ফাঁকি দিতে সেই জমির মূল্য দলিলে তুলেছেন ৪০ লাখ টাকা, যা ২০১৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ৫৯৩৬ নম্বর দলিলে দাতা হাসান আলী রেজিষ্ট্রি মূলে মিলন সরকারের কাছে বিক্রি করেন। এতোসব অনিয়ম ও সীমাহীন দুর্নীতি করেও এখনো কি করে পৌরসভায় চাকরি করছেন মিলন সরকার তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। গত ১৬ জানুয়ারি পৌর নির্বাচনে জনগণের রায়ে নতুন মেয়র মতলুবর রহমান নির্বাচিত হলে আলোচনার কেন্দ্র বিন্দু হয়ে ওঠে এই মিলন সরকার। বেরিয়ে আসতে থাকে তার দুর্নীতির ফিরিস্তি। আর এসব দুর্নীতি আমলে নিয়ে তদন্ত হওয়া দরকার বলে মনে করছেন পৌর নাগরিকরা।

অটোবাইকের নবায়ন ফরমের মূল্যের ব্যাপারে পৌরসভার সহকারী কর আদায়কারী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নবায়ন ফরমের মূল্য ২০ টাকা করে। ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে এ পর্যন্ত ১৪০০-এর বেশি ফরম বিক্রি হয়েছে। কিন্তু এই ২০ টাকার রশিদ না দেয়ার বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। এটা উপর তলার বিষয়। সেখানে সুচনা সরকার নামে একজন এই টাকা নেন। তিনি বিষয়টি জানেন। মিলন কুমার সরকার তার পূবালী ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে এলআর ফান্ডের টাকা বিভিন্ন সময়ে জমা রাখার নির্দেশ দিতেন বলেও জানান তিনি। সাঁটলিপিকার মিলন সরকারের বিষয়ে সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) গাইবান্ধার সহ-সভাপতি অশোক শাহ বলেন, পৌরসভার একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর এমন কর্মকান্ড যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের অপরাধ। আমি মনে করি এই মিলন সরকারের পেছনে যে বা যারা সহযোগিতায় যুক্ত থাকুক না কেন তদন্ত করে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা দরকার। আমরা প্রত্যশা করব নব নির্বাচিত মেয়র সব দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবেন। অভিযুক্ত মিলন সরকারের কাছে তার দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এতোসব অভিযোগের কোনোটাই সঠিক নয়। অটোবাইকের নবায়ন ফি বাবদ নির্ধারিত ফরম মূল্যের বিপরীতে রশিদ না দেয়ার বিষয়টি ঠিক আছে। তবে এই টাকাগুলো আমরা একটি খাতার মাধ্যমে জমা করি। মিলন বলেন, পার্ক রোড শাখার পূবালী ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে আমার এতোটাকা লেনদেন হয়নি।

 

২০১৯ সালে জমি কেনার সময় আমার শাশুড়ি চাকরির অবসরের ১৮ লাখ টাকা আমাকে গোবিন্দগঞ্জের একটি ব্যাংক থেকে পঠিয়েছেন। ২০২০ সালে আমার ছোট ভাই একটি জমি বিক্রি করে আমাকে ১২ লাখ টাকার চেক দিয়েছিলেন। সেই চেকটি আমি আমার ব্যাংক একাউন্টে জমা দিয়েছি। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে অফিসের টাকা আমার ব্যাংক একাউন্টে জমা করেছি। পরে সেই টাকা আবার তুলে অফিসে জমা দিয়েছি। জায়গাসহ বাড়ি কেনার বিষয়ে মিলনের ভাষ্য, আমার একটা জায়গা বিক্রি করে যে টাকা পেয়েছি সেই টাকা ও ব্যাংক লোনসহ বিভিন্ন সমিতির লোনের টাকা দিয়ে জায়গাসহ একটি বাড়ি কিনেছি।

অফিসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর না করার বিষয়টি অস্বীকার করে মিলন বলেন, অফিসে এসে দেখে যান আমার হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর আছে কিনা। গোরস্থানের জায়গা পাকা করণ বাবদ টাকা আত্মসাতের বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেছেন। বলেছেন,পৌরসভার কোনো টাকা আমি আদায় করি না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here