আমেরিকার জাতীয় কবিতার মাস

0
10

 এবিএম সালেহ উদ্দীন

এপ্রিল মাস আমেরিকার কবিতার মাস। কয়েক বছর আগে এপ্রিলকে আমেরিকার জাতীয় কবিতার মাস হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়।

তার পর থেকেই আমেরিকার সর্বত্র যথাযথ মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে এপ্রিলকে কবিতার মাস হিসেবে পালন করা হয়। কবিতাকে সর্ববিস্তারী করে তোলার জন্য পুরো একটি মাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কবি-সাহিত্যিকদের মাঝে মুখর হয়ে থাকে কবি ও কবিতার কর্মশালা। কবিতা কী? আমরা কবিতা কেন পড়ি এবং কেন লিখি? প্রশ্নটি ছোট হলেও তার অর্থ অনেক ব্যাপক। যিনি সৃষ্টি করেন তাকে যেমন স্রষ্টা বলা হয়; কবিতা যিনি লেখেন তাকে কবি বলা হয়। কবির দায়িত্ব সৃষ্টি করা। সৃজনে মননে সাহিত্যের সুশীল ছায়ায় সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে মানুষের জন্য কবিতাকে ছড়িয়ে দেওয়া। এই পৃথিবীর সৃষ্টিকুল এবং মানুষের জন্য ছন্দময় পঙ্্ক্তিমালায় সাজিয়ে কবিতার ফরম্যাট তৈরি হয়। সেই শক্তির বলয়ে অন্তরস্পর্শী লেখার মধ্য দিয়ে কবি যা লেখেন, সেটিই কবিতা।

এই গুরুদায়িত্বটি কবির ওপরই বেশি বর্তায়। রাষ্ট্রপুঞ্জ যেমন জনকল্যাণের বাইরে রাষ্ট্রীয় নীতিমালা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করে, তেমনি কবির সৃষ্টিশীল রচনা কবিতা হয়ে পাঠকের জন্য অনুকরণীয় নীতিমালার সৃষ্টি করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ কবি ও সাহিত্যিক নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কথা অনুপাতে বলতে হয়, ‘একজন কবি যখন নিজের মুক্তির কথা লিখছেন, তা পড়ে অন্যরাও মুক্তি অনুভব করছে। কবি তো সরস্বতীর সঙ্গে দায়িত্বতার চুক্তি করে লিখতে বসছেন না। তবে কবির দায়বদ্ধতা থাকে কবিতার প্রতি, নিজের প্রতি।’ কবিকে সর্বদা আত্মমগ্ন থাকতে হয়। আমি মনে করি, কবিকে অবশ্যই সৃষ্টিশীলতার গুরুত্বের প্রতি দৃষ্টি রেখে স্বনির্মিতির ওপর অটল ও অবিচল থাকতে হবে।

কবি মূলত বিত্তহীন। তার মূল সম্পদ হচ্ছে তার সৃষ্টিকর্ম ও নিজস্ব কাব্যবোধ। কবিতার গুণে ও মহত্তের দ্বারা সবকিছুর ঊর্ধ্বে একজন কবির কাছে মানুষ ও প্রকৃতি হচ্ছে আসল চিন্তার উৎস। কবিতা চিরকালই একজন কবির মনন ও চেতনায় সৃজনশীলতার প্রকৃষ্ট সম্পদ। মানুষের পক্ষে নিঃস্বার্থ, নিরপেক্ষতার নিঃশর্ত ঘোষণা দিয়েই কবিরা কাব্যরচনা করেন। একজন প্রকৃত কবির কাজ মূলত তা-ই। কেননা কবিতা সর্বদাই জীবন্ময় ও মানুষের জীবনের শক্তিময়তার জোগানদাতা। কবিকে তার কবিতার মাধ্যমে সেটি আয়ত্ত করে নিতে হয়। একটি ভালো কবিতা একজন দৃঢ়চেতা বিশ্বাসী মানুষের মতো। বিশ্বাসী মানুষের সান্নিধ্য লাভ করতে যেমন সবাই চায়, তেমনি একটি ভালো কবিতাও পাঠক আশা করে, যা মানুষের স্বপ্ন-সম্ভাবনা ও আশার দুয়ার খুলে দেয়। মোটকথা, একটি কবিতা পাঠ করার মধ্য দিয়ে আমরা সত্যিকারভাবে বিশ্বাসের আলো পেতে পারি। সেই কবিতা সবাই প্রত্যাশা করে। একটি ভালো কবিতা বিশ্বাসের দীপ্তিকে অবারিত করে।

মানব চৈতন্যে আনন্দ ও পরিতৃপ্তির খোরাক জোগায়। একটি ভালো কবিতার যে আনন্দ আছে, তৃপ্তি আছে; একজন সত্যিকার কাব্যপ্রেমী মানুষই তার অনুভব ও উপলব্ধির মধ্য দিয়ে ঋদ্ধ হন এবং সিক্ত হয়ে ওঠেন। কবিকে আমি আলোকিত মানুষ মনে করি। যিনি আগামীকে দেখেন এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য লিখে যান। একজন প্রকৃত কবিকে যখন সত্যিকার মানুষ হিসেবে পেয়ে যাই, তখন আনন্দের সীমা থাকে না। কবি সর্বদাই চক্ষুষ্মান ও সত্যান্বেষী। তাকে সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকতে হয়। সত্যের নিরন্তর অন্বেষণ হচ্ছে কবির প্রধান দায়িত্ব ও কাজ। সত্যানুসন্ধানের মধ্য দিয়ে কবি সর্বদা মানুষ ও প্রকৃতির ভবিষ্যৎ পথনির্দেশনার কাজটি করতে পারেন। কবির মধ্যে মানবিক ও প্রাকৃতিক উভয় দিকের সাম্যদর্শন আছে, যা দ্বারা তিনি অনাগত ও ভবিষ্যতের স্বপ্নদ্রষ্টায় বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন। কবির মাঝে প্রেম, বিরহ-বেদনা, দ্রোহ, বিদ্রƒপ ও প্রতিবাদের প্রখর চেতনাবোধ থাকে। ওই চেতনার মধ্য দিয়ে তিনি পৃথিবী, মানুষ ও প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করেন। মানুষকে ভালোবাসেন এবং কবিতার বাণী দিয়ে ভালোবাসতে উদ্বুদ্ধ করেন। কবিতার মাসের কথা বলতে গেলে প্রথমেই আমাদের আমেরিকার কবিতা ও কবিদের দিকেই তাকানো উচিত।

আমেরিকায় হাজার বছর ধরেই চলে আসছে কবিতার চাষ। শিক্ষা, সামাজিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টির জন্য আমেরিকার সর্বত্র শিল্প-সাহিত্যের কদর আছে। কবিতার গতিময়তা এবং সর্বব্যাপী কবিতাকে সর্বত্র গ্রহণযোগ্য করে তোলার নিরন্তর প্রয়াসে এপ্রিল মাসকে কবিতার মাস বলা হয়। কবিতার জাগরণে আমেরিকায় এপ্রিল মাসে নানাবিধ কার্যক্রম বিদ্যমান। কবিকে ইতিহাসের নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে বেঁচে থাকতে হয়। পূর্বগামী কবির কাছ থেকে স্পৃহাবোধ সংগ্রহ করে তিনি নিজের কবিতাটিকে ভবিষ্যৎ নিয়তির ওপর ছেড়ে দিতে উদ্যত হন। কবিতার মধ্য দিয়ে প্রেম, বিরহ, দ্রোহ এবং ভালোবাসার পথ সৃষ্টি করেন। কবিতার স্থিতি ও পরিমিতির মধ্য দিয়ে কবিকে যেমন প্রেম ও রোমান্টিকতা আস্বাদন করতে হয়, তেমনি মানুষের স্বার্থেই কবিকে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে হয়। কবিতার স্পষ্ট উচ্চারণের মধ্য দিয়ে বৈষম্যের পরিবর্তে তাকে সাম্যের পথ নির্ণয় করে দিতে হয়। প্রজাপতি যখন মধুপানের জন্য ফুলে বসে, তখন অজান্তেই তার পায়ে লেগে যায় মায়াবী পরাগ। ফুল থেকে ফুলে বসার মধ্য দিয়ে প্রজাপতির মায়াবী পরাগের যেমন মিলন ঘটে, তেমনি একজন কবির চোখ দিয়ে আরেকজন কবির সৃষ্টিকর্ম ও সত্তার সাথে মিশে যেতে হয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি সেভাবেই দেখতে শিখেছি।

অন্য কেউ এতে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। তবে আমার দেখার মাঝে আড়ষ্ঠতা কিংবা গোঁজামিলের সুযোগ নেই। কবি ও কবিতাকে বিচার করতে হলে অপরের সৃজনের প্রতি সম্মানবোধ থাকতে হবে। যিনি এটি করতে পারেন, মূলত তিনিই উত্তম মানুষ। অন্যজনের সঙ্গে মতের বেমিল থাকতে পারে। কিন্তু তার উত্তম সৃষ্টিকর্মের অবমূল্যায়ন করার অধিকার কারো নেই। সাহিত্যের অভিধারায় একজন কবি অন্য কবিকে সে রকম পরাগমিলনের মতোই দেখা উচিত। কেননা, কবিকে তার কবিতার অসম্ভব বীজগুলো সবার জন্য উজাড় করে দিতে হয়। এভাবেই কবিতা মানুষের মধ্যে প্রেম, মমত্ববোধ এবং অপার ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে। কবিতার মাঝে বিশ্বাসের দীপ্তি আছে। মেধা ও মননশীলতার সঞ্চরণ আছে। সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে একজন প্রকৃত কবির মধ্যে সুনির্মল কাব্যভুবন তৈরি করার আছে অদম্য স্পৃহা ও শক্তি সঞ্চয়ের প্রবল আগ্রহ। কেননা উপলব্ধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here