পাইকগাছায় ৫০ বছরেও গেজেটভূক্ত হতে পারেননি মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল:কুড়ে ঘরে মানবেতর জীবন যাপন পরিবারের

0
2

 মোঃ ফসিয়ার রহমান : –

জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালে চাকরীর মায়া ত্যাগ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন আব্দুল জলিল।

যে দেশের স্বাধীন পতাকা এনে দিয়েছেন সেই মানুষটির সরকারী গেজেটে নাম উঠেনি দীর্ঘ ৫০ বছরেও! মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়ার সবাদে তার চাকরীটাও সেসময় জাতীয়করণ হয়নি। মোঃ আব্দুল জলিল মুক্তিযুদ্ধের সনদ পেলেও পায়নি সরকারী গেজেটে নাম উঠাতে। ফলে তার পরিবারের মাঝে চরম ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। মোঃ আব্দুল জলিল গাজী খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার সাবেক গদাইপুর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের ( বর্তমানে পাইকগাছা পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ড) এক সম্ভান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর প্রয়াত পিতা মোহর আলী গাজী ও মাতা নবি বিবি। সংসারে অভাব অনাটনের কারণে লেখা-পড়ায় বেশিদুর এগুতে পারেননি। কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে পাইকগাছা পাউবো অফিসের পাম্প ড্রাইভার হিসেবে মাস্টাররোলে চাকরী করতেন।

১৯৭১ সালের ১০ জুন তিনি চাকরীর মায়া ত্যাগ করে ও স্ত্রী-সন্তানদের রেখে দেশকে শত্রু মুক্ত করতে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের জন্য অফিসের স্পিড বোড নিয়ে চলে যান এবং মুজিব বাহিনিতে যোগদিয়ে ৯ নং সেক্টরের অধিনে হাতিয়ার ডাঙ্গা ক্যাম্পে ট্রেনিং গ্রহন করেন। ট্রেনিং শেষে তিনি মুজিব বাহিনীর কমান্ডার শেখ শাহদাৎ হোসেন বাচ্চুর নেতৃত্বে কপিলমুনি, কেয়ারগাতী ও খুলনা বেতার কেন্দ্রে যুদ্ধ সহ বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দেশ স্বাধীনের পর তিনি আবারো বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহারকৃত অস্ত্র রাইফেল ৩০৩ জমা দেন। অফিসকে অবহিত না করে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ায় তাকে অন্যত্র বদলী করেন তৎকালী পাউবোর কর্মকর্তা। দেশ স্বাধীনের পর চাকরীতে যোগদান করলেও তাকে জাতীয় করণের আওতায় আনা হয়নি! স্বাধীনের পরে যারা মাস্টাররোলে যোগদান করেন তাদেরও চাকরী জাতীয় করণ হলেও আব্দুল জলিলের কপালে হয়নি সরকারী চাকরী! ৯ জনের সংসার চালাতে গিয়ে নিদারুন কষ্টে কেটেছে তার সারাটি জীবন। সন্তানদের দিতে পারেননি পেট পুরে খাবার ও শিক্ষা।

১৯৮৪ সালে চাকরী জাতীয় করণের দাবী করে তৎকালীন রাষ্ট্র প্রধান হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ এর নিকট আবেদন করেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল গাজী। তার আবেদনের পর ২৪/০৯/ ১৯৮৮ তারিখে তার চাকরী জাতীয় করনের জন্য পানি উন্নয়ন বোডের সচিব স্বাক্ষরিত ফাইল পাঠানো হয় সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। পরবর্তিতে ১৯৯২ সালের ২৭ মার্চ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যবরন করেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল। মৃত্যুর পর ৬ দিনের বেতন ৫৫০ টাকা ও অফিসের সকল কাগজ-পত্র তার পরিবার কে বুঝিয়ে দেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাইকগাছা অফিসের তৎকালীন কর্মকর্তারা। মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল গাজীর চাকরী সরকারী করণ হয়েছে তার মৃত্যুর আরো তিন বছর পর অর্থাৎ ১৯৯৫ সালে। মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিলের মুত্যুর প্রায় ২০ বছর পর ছেলেরা জানতে পারে তার পিতার চাকরী জাতীয় করণ হয়েছে ১৯৯৫ সালে! কিন্তু কোন অবসার ভাতা আজ ও জোটেনি মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল ও তার পরিবারের সদস্যদের। দেশ স্বাধীনের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় কর্তৃক “স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদপত্র ” দেয় মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল কে। যার নং – ৪৩৫৫০। পরবর্তিতে ১৯৯২/১৯৯৬/২০০৪ সালের মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছায়ে অংশ গ্রহন করলেও কোন ফল পাইনি মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল ও তার পরিবার। ২০১৭ সালের মুক্তিযোদ্ধা যাচাইবাছায়ে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল এর স্ত্রী রোকেয়া বেগম অংশ গ্রহন করেন।

সেসময় যাচাই বাছায় কমিটির সাত সদস্যের মধ্যে ৬ জন্য সদস্য আব্দুল জলিল কে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করলেও কমিটির সভাপতি খুলনার তেরখাদা থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধা এড. মুজিবর রহমান দ্বিমত পোষণ করায় (খ) তালিকাভূক্ত হয়। পরবর্তিতে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিলের স্ত্রী খ তালিকারভূক্তির বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেণ। যার নং ৪৬৪১/১৭ ইং। অদ্যাবধি পিটিশনটি চলমান। জামুকা রেজিস্টার নং ৬৮৪। এতো কিছু করার পরেও মুক্তিযুদ্ধার গেজেট ভুক্তির সদন পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ৫০ বছর। আর কত বছর অপেক্ষায় থাকলে মিলবে মুক্তিযোদ্ধার গেজেটভূক্তির সম্মান? ১৯৮৪ সালে পাইকগাছা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সুবল চন্দ্র মন্ডল, ২০০৬ সালে পাইকগাছা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শেখ শাহদাৎ হোসেন বাচ্চু, যুদ্ধ কালীন কমান্ডার গাজী রুহুল আমিন, ২০১০ সালে যুদ্ধহাত মুক্তিযোদ্ধা শেখ বেলাল উদ্দীন বিলু, ২০১২ সাবেক কমান্ডার আবুল কালাম আজাদ, ২০১৬ সালে খুলনা জেলা মুজিব বাহিনী প্রধান কামরুজ্জামান টুকু, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সরদার মাহবুবর রহমান, যুদ্ধকালীন কমান্ডার কোরবান আলী, সহকারী কমান্ডার আব্দুল আলী, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা রওশন আলী খাঁ, অমল বৈরাগী মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল গাজী কে প্রকৃত মুজিব বাহিনীর সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রত্যায়ন পত্র দিলেও আজও গেজেটভূক্ত মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মেলেনি। মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিলের বৃদ্ধা স্ত্রী রোকেয়া বেগম বলেন, একজন প্রতিবন্ধী সহ ৭ সন্তান নিয়ে নিদারুন কষ্টে আছি। কোন জমি জায়গা না থাকায় পাইকগাছা পানি উন্নয়ন বোডের যায়গায় কলোনিতে কুড়ে ঘরে মানবেতর জীবন যাপন করছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী আ খ ম মোজাম্মেল হক ও মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সচিব তপন কান্তি ঘোষ মহোদয়ের নিকট আমার স্বামী আব্দুল জলিলের গেজেটভূক্তির জোর দাবী জানাচ্ছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here