সমাজের বোঝা নয়,মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই–শারীরিক প্রতিবন্ধী মিম

0
27

 

রবিউলইসলাম,রাজশাহীঃ

প্রমি আক্তার মিম রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পীরগাছা গ্রামে ৩০ ডিসেম্বর ২০০২ইং সনে জন্ম গ্রহন করেন । তার বর্তমান বয়স (১৮) বছর। পিতা মজিবুর রহমান এবং মাতা ফিরোজা বেগম। ফিরোজা বেগম তিন সন্তানের জননী। তিনি অনেক কষ্ট করে তার দুইটি প্রতিবন্ধী সন্তানের লালন পালন করে যাচ্ছেন। ত্যাগ করেছেন জীবনের কতইনা স্বাদ আল্লাদ। মিম শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেও সে অত্যন্ত মেধাবী। শরীর না চললেও তার মন মস্তিষ্ক আর বুদ্ধিমত্ত্বা অপরিসীম। হঠাৎই একদিন মিমের মনে প্রশ্ন জাগে? কে আমি? কি আমার পরিচয়? এই সমাজের এক কোনে পড়ে থাকা কোন মূল্যহীন পাথর যেনো। যাকে কেউ বোঝে না, যার কথা কেউ ভাবে না। যার কষ্ট গুলো কেউ অনুভব করে না। এই জগৎ সংসারে সে মূল্যহীন, যেন ঝরে পড়া কোন ফুল। যেটা শুকিয়ে গেলে সবাই ফেলে দেয়। কারো কাছে যেমন মূল্য থাকে না। ঠিক তেমনি মূল্যহীন । আমার মতো অনেকেই আছে যারা বোঝা হিসাবে এই জগতে আছে। কিন্তুু,আমিতো এমন হতে চাই নি। তাই মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে আমার একটাই প্রশ্ন; কেন আজ আমি সবার বোঝা? কেন এত অবহেলা সহ্য করতে হয় আমাকে? কি আমার অপরাধ? মনের কোনে জমে থাকা শত প্রশ্ন উপেক্ষা করে মন কে শান্ত করে আর ভাবে। তবে স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞ যে তিনি মানুষ রুপে আমাকে এই সুন্দর জগতে পাঠিয়েছেন।
কেন গো স্রষ্টা? করে সবাই,
মোরে এত অবহেলা।
কেন গো স্রষ্টা? জীবনে মোর,
এত কঠিন জ্বালা।
ঝরে পড়া শুকনো ফুল যে আমি,
মূল্য কভু নাহি যার।
এত অবহেলা, এত কান্না, এত যন্ত্রনার,
সমাপ্তি কি নাহি আর ?
মিম সকলের কাছে বোঝা। আপন মানুষ গুলো আর কেউ আপন হয় না। অনেকেই মিম কে নিয়ে উপহাস করে,,তার শারীরিক অসুস্থতার জন্য। আর তাই ক্ষনে ক্ষনে শুধু পেতে হয় আঘাত আর আঘাত। এলাকার সকলের কাছে অবহেলারই পাত্র যেন? মিম জন্ম থেকেই একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। তার এই শারীরিক প্রতিবন্ধীকতার জন্য,,এমনও অনেক মানুষ আছে যারা তার মায়ের সামনে ,,উপহাস করে বলে,,ওরকম প্রতিবন্ধী একটি মেয়েকে পড়িয়ে কী হবে? জজ হবে নাকি ব্যারিস্টার হবে?লোকের মুখে এই কথাগুলো শুনে মা আর মেয়ের চোখ যেন অশ্রুতে টলমল করে। মিম মনে মনে ভাবে মায়ের গলা জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলি।

মিম অশ্রুশিক্ত নয়নে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে আর বলে, মা আমি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী বলে কি,আমার লিখাপড়ার অধিকার নেই? জজ ব্যারিস্টার নাই বা হতে পারলাম,,, লিখাপড়া শিখে যেই জ্ঞানার্জন আমি করতে পারি,,সেটার কি কোন কিছুর সাথে তুলনা হয়?

মিম যখন পরিবারে ছোট্ট ছিল,,,মিমকে পেয়ে সবাই খুশি ছিল। কারন মিম তখন পরিবারের একমাত্র মেয়ে ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে আঁধার নামল গ্রামের হাঁসি-খুশি এই পরিবারটিতে। বড় হচ্ছিল ঠিকই কিন্তুু হাটতে পারছিল না মিম। আস্তে আস্তে শারীরিক প্রতিবন্ধীতে রুপ নিল । ভেঙ্গে পড়লেন মিমের মা-বাবা। অনেক চিকিৎসা করানোর পরও কোন ফল পাওয়া হয় নি। মিম যখন পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ে তখন তার ফুটফুটে একটা ভাই হলো,,। কিন্তুু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস মিমের ছোট ভাইটাও শারীরিক প্রতিবন্ধী হলো। মিমের মা – বাবা পড়ে গেলেন আরো দুশ্চিন্তায়। তার বাবা মা ছোট ছেলের
নাম রাখলেন ওয়াকিয়া হুমায়ুন আদিব। তবে বর্তমানে এই পরিবারটির একমাত্র ভরসা তাদের বড় সন্তান । মিম বলেন,আঘাতে,অবহেলায় বেঁচে আছি। অনেক সময় আপনজনেরাও আপন হয় না। আমি নিজের কষ্ট কারো সাথে শেয়ার করতে পারিনা। না পারি মায়ের সাথে শেয়ার করতে।কারন, আমার মা নিজেই থাকে অনেক টেনশনে। আমি আমার মায়ের টেনশন বাড়াতে চাই না। তাই যখন বাসায় কেউ না থাকে,একা থাকি তখন প্রাণ খুলে কাঁদি। সেটা কেউ দেখে না একমাত্র স্রষ্টা ছাড়া। এত আঘাত এত যন্ত্রনা আর প্রানে সহে না,যখন আপনজনেরাই আঘাত দেয়। তখন জগতটাই যেন আঁধারে ঢেকে যায়।মাঝে মাঝে বাঁচার ইচ্ছেটাও হারিয়ে যায়,কিন্তু আমি পরে ভাবি যে,বাঁচতে হবে আমায়। শুধু আমার মায়ের জন্য,,,শুধু আমার মায়ের জন্য,
“এত আঘাত এত যন্ত্রনা
নাহি বা দিলে কাউকে।
মানবতা দিয়ে থাকো পাশে
একে অপরের দুখে।।
ওহে মানবজাতি বলো আজি
নাহি কী শরীরে তব,মায়ের ভালোবাসা।
কাড়তে চাও কেন গো?
কারো বেঁচে থাকার আশা।।”
এভাবেই ছিল মিম,টুকটাক লিখালিখিও করতো,তবে তেমন কোন গুরুত্ব দেয় নি সে। একদিন তাদের বাড়িতে এলেন গ্রামীণ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা। মিমের নিজ হাতের টুকিটাকি ছোট গল্প, কবিতা, গান এই লেখা তার খুব ভালো লেগেছিল। তাই তিনি মিমকে উৎসাহ দিয়ে বলে ছিলেন, তুমি পিছিয়ে থেকো না,আমাদের আছে বাহুবল আর তোমার আছে মেধাশক্তি।এই মেধাশক্তির জোরে তুমি অনেক কিছু করতে পারবে। এনজিও কর্মী ও তার মায়ের উৎসাহে মিম নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। নতুন উদ্যমে আবারও শুরু করে লিখালিখি। বর্তমানে সে কবিতা,গান,গজল সব মিলিয়ে ১৯৭টি এবং ৩-৪টা গল্পও লিখেছে। মিম এতটাই মেধাবী যে কোনো কিছু একবার দেখলে বা শুনলেই মূহুর্তে লিখে দিতে পারে ছন্দ মিলিয়ে গান, গজল ও কবিতা। তবে মিম আজ পযন্ত লিখাপড়া সহ যা কিছু করেছে তা সবই তার মায়ের জন্য। মিমের জীবনে বেঁচে থাকা যেন এক বিরাট যুদ্ধ। তার জীবন যুদ্ধের একমাত্র সঙ্গী তার মা। মিমের চলার পথে তার মা-বাবাই যুগিয়েছেন সাহস। মিম আরো এগিয়ে যেতে চায়।

শারীরিক প্রতিবন্ধী মিমের দৃঢ় বিশ্বাস তার
মা-বাবার দোয়া আর স্নেহের পরশে একদিন ঠিকই এগিয়ে যাবে এবং লক্ষ্যে পৌছাতে পারবে। তবে মিম চান সকলের সহানুভূতি, ভালোবাসা এবং সহযোগিতা।

“হারাবো না মনোবল আমি
রাখবো মনের জোর।
একদিন আমি ভাঙবো ঠিকই
আঁধার ঘরের দোর।।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here