গাইবান্ধা পৌরসভায় একজনের দখলে পৌরসভার তিন পদ!

0
11

মোঃতৌহিদুর রহমান তুহিন জেলা প্রতিনিধি গাইবান্ধা নাম অমিতাভ চক্রবর্তী। দাপ্তরিক পরিচয় গাইবান্ধা পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেলো তিনি আরো দুটি পদ দখল করে আছেন। চাকরিবিধি ভঙ্গ করে ২০০৮ সালে হন প্রধান সহকারী। এরপর ২০১৫ সালে একইভাবে হন প্রশাসনিক কর্মকর্তা। চাকরির শুরুটা হয় স্টোরকিপার হিসেবে। দুর্নীতির শুরুটাও সেখান থেকে। ইচ্ছেমত অফিস করা,হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর না করে বেতন তোলাসহ অনেক অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

হাজিরা খাতা অনুযায়ী অমিতাভ চলতি বছরের প্রথম মাসেই অনুপস্থিত রয়েছেন এক মাস! নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে গাইবান্ধা পৌরসভার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হলেও উন্নয়নের ছোঁয়া লেগে অমিতাভসহ কিছু অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারীর ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে। অমিতাভ চক্রবর্তী ২০০০ সালের ১ অক্টোবর স্টোরকিপার হিসেবে পৌরসভায় যোগ দেন। বর্তমানে তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা হলেও তার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণে আছে হিসাব রক্ষক ও স্টোরকিপার পদটিও। নিয়ম অনুযায়ী একজন কর্মকর্তা একাধিক পদে কাজ করতে গেলে মেয়রের লিখিত অনুমোদন থাকতে হয়। এ সংক্রান্ত কোনো আদেশ তার নথিপত্র ঘেটে পাওয়া যায়নি।

পাঁচ বছরে স্টোর রুম থেকে লাখ লাখ টাকার মালামাল বিক্রির লোভ সামলাতে না পেরে মূলত ‘ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ায় ধরে রেখেছেন পদগুলো। সাম্প্রতিক করোনাকালে দরিদ্র জনগোষ্ঠির জন্য বিভিন্ন সহায়তা ও ত্রাণের প্রায় অর্ধকোটি টাকার খাদ্য সামগ্রী ক্রয় সংক্রান্ত জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও গেল বছরে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ত্রাণ সামগ্রী ক্রয়ের মোটা অংকের টাকা আত্মসাত করেছেন অমিতাভ চক্রবর্তী। চাকরির শুরু থেকে এভাবেই অবৈধভাবে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তিনি।

সংশ্লিষ্টরা স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, পৌরসভায় অমিতাভ চলেন ‘জোর যার মুল্লুক তার’ স্টাইলে। অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ থাকলেও অজানা কারণে সেই অভিযোগের তদন্ত করেননি কোনো মেয়র। ২০০৩ সাল থেকে অমিতাভ নির্বিঘ্নে তিন পদ দখলে রেখে চালিয়ে যাচ্ছেন তার অসাধু সব কর্মকাণ্ড। ২০১৬ সালে সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার হিসাব রক্ষক আবু রায়হান তৎকালীন মেয়র শাহ্ মাসুদ জাহাঙ্গীর কবির মিলনের সঙ্গে কথা বলে গাইবান্ধা পৌরসভায় বদলি নিয়ে এলেও তাকে জামায়াত-শিবির আখ্যা দিয়ে যোগদান করতে দেননি এই অমিতাভ। পরবর্তীতে একই বছরে দিনাজপুর পৌরসভায় যোগদান করে আজ অবধি দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন রায়হান। পৌর অফিস সূত্রে জানা গেছে, অর্থলোভী এই কর্মকর্তা এমজিএসপি প্রকল্প থেকে কয়েকবার সফটওয়্যারের ট্রেনিং নিয়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে পৌরসভার হিসাব বিভাগ পরিচালনা করার নির্দেশনা পান। সফটওয়্যারসহ ডিজিটাল সব সুবিধা পেয়েও অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে পৌরসভার দাপ্তরিক সব কার্যক্রম এনালগ পদ্ধতিতেই পরিচালনা করে আসছেন তিনি।

অফিসের রাজ্বস্ব খাত থেকে উন্নয়নের নামে বিভিন্ন ভাউচার বিল দেয়ার ক্ষেত্রে মোটা কমিশন নিয়ে থাকতেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে। তৃতীয় শ্রেণির চাকরি করেও এই কর্মকর্তার বিলাসী জীবন যাপনে পৌরবাসী হতবাক ও বিস্মিত হয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, আমার ২০১১ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চার বছরের বকেয়া সিলেকশন বিল চার লাখ ৩৬ হাজার টাকা আটকে যায়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করার পর আমাকে নবম গ্রেড থেকে পদোন্নতি দিয়ে সপ্তম গ্রেডে পদায়ন করা হয়। সেই সঙ্গে পৌরসভায় লিখিতভাবে চার বছরের বকেয়া সিলেকশন বিলের টাকা দেয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু টুপাইস না দেয়ার কারণে হিসাব রক্ষক অমিতাভ চক্রবর্তী আমার প্রাপ্য সেই সিলেকশন বিলের ফাইল তার টেবিলেই আটকে রেখেছেন। এ ব্যাপারে তৎকালীন মেয়রের কাছে একাধিকবার বলেও কোনো সুরাহা পাইনি।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে অমিতাভ চক্রবর্তী বলেন, তিনটি পদে থাকার বিষয়টি সঠিক নয়। আমি মূলত প্রশাসনিক কর্মকর্তা। হিসাব রক্ষক পদে লোক না থাকায় দায়িত্ব পালন করছি, তবে এ বিষয়ে লিখিত কোনো অনুমতি নেই। অনুমতি ছাড়াই ১৭ বছর ধরে কিভাবে অমিতাভ দায়িত্ব পালন করছেন এমন প্রশ্ন করা হলে অমিতাভের পাশের চেয়ারে থাকা একই দপ্তরের ক্যাশিয়ার আবু হোসেন ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আমার ২৫ বছরে চাকরি জীবনে একটিও পদোন্নতি পাইনি। পৌর পরিষদের সিদ্ধান্ত ছাড়াই অবৈধভাবে হিসাব রক্ষক পদটি ১৭ বছর ধরে দখল হয়ে আছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী সেই পদে অনেক আগেই আমার পদায়ন হওয়ার কথা। বিগত মেয়রদের আমলে কয়েক দফায় আমার পদোন্নতির ফাইলটি মেয়রের টেবিলে গেলেও অদৃশ্য কারণে তা লাল ফিতায় বন্দি থেকে যায়। পরে অফিসের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর না করার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অমিতাভ চক্রবর্তী নিরব ভূমিকা পালন করেন। পৌরসভার এই প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিষয়ে সমাজকর্মী ও সাংবাদিক আফতাব হোসেন বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে এককভাবে দপ্তরের তিনটি পদ দখল রেখে কোনো কর্মকর্তাই দাপ্তরিক কাজ চালাতে পারেন না। আর চালালে সেখানে দুর্নীতি হবে, এটাই স্বাভাবিক।

এমন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার ব্যাপারে তদন্ত করে পৌর মেয়রের ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ। হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বিপুল কুমার সাহা বলেন, অমিতাভ চক্রবর্তী মূলত প্রশাসনিক কর্মকর্তা। পাশাপাশি হিসাবরক্ষক পদটিও তিনি দেখেন। আমার জানামতে তিনি দুটি পদের দায়িত্বে আছেন। হিসাব বিভাগে সফটওয়্যার ব্যাবহার না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পৌরসভায় আমি যোগদানের পর সফটওয়্যারের মাধ্যমে হিসাব শাখার কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেখিনি। পরবর্তীতে সফটওয়্যার এলেও তৎকালীন মেয়র অনুমতি না দেয়ায় তার ব্যাবহার হয়নি।

তবে গত বছর থেকে ট্রেড লাইসেন্স শাখাটি সফটওয়্যারের আওতায় আনা হয়েছে। পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী ও ভারপ্রাপ্ত সচিব এবিএম সিদ্দিকুর রহমানের কাছে প্রশাসনিক কর্মকর্তা অমিতাভ চক্রবর্তীর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অমিতাভ পৌরসভায় দুটি পদে আছেন। পরবর্তীতে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, হিসাব রক্ষক ও পূর্বের স্টোরকিপার পদসহ তিনটি পদের দায়িত্বে আছেন বলে স্বীকার করেন তিনি। কিন্তু একাধিক পদে থাকার বিয়য়ে লিখিতভাবে দাপ্তরিক কোনো নির্দেশনা আছে কিনা এমন প্রশ্নে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here